মা

সমর রায়চৌধুরী

(উৎসর্গ : পথের পাঁচালী ও অপরাজিত'র 'সর্বজয়া' করুণা বন্দ্যোপাঠ্যায়কে)
অনেকদিন আগে দেখা একটি বেশ হিট হিন্দী ফিল্মের কথা মনে পড়ে, যেখানে বড় ভাই আর্থিক দুরবস্থা ও দু:সময়কে পর্যুদস্ত করে অন্ধকার জগতের হাত ধরে হয়ে ওঠা এক বিত্তবান মানুষ আর ছোটভাই সৎ ও নিষ্ঠাবান পুলিশ অফিসার, মা তার কাছেই থাকে। একসময় ছোট ভাই বড়ভাইকে অন্ধকার জগতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে সৎ পথে ফিরে এসে à¦¸à§à¦¨à¦¾à¦—à¦°à¦¿à¦•à§‡à ° জীবন যাপনের সুপরামর্শ ও আবেদন জানালে, বড়ভাই ‌'সততা ধুয়ে কি জল খাবো?' এরকম একটা মনোভাব নিয়ে ও তার বিত্ত-বৈভবৠর আস্ফালন দেখিয়ে বলে-(হুবহু না হলেও অনেকটা এরকমই)-মেরা য়ে বাঙলা,কার, রূপাইয়া, নৌকর-à¦¨à§Œà¦•à¦°à¦¾à ¨à¦¿, য়ে শান্ অউর শওকত দেখতে হো? য়ে সব কুছ হ্যায় মেরা কালা ধান্দাসে, তুমহারা পাস কেয়া হ্যায়? এর পরিপ্রেক্ঠ·à¦¿à¦¤à§‡ বিনম্র ছোটভাই যে দৃঢ় ও আত্মপ্রত্ঠয়ী,অত্যন্ত ছোট্ট এবং মোক্ষম জবাবটি দেয় তা à¦­à§‚à¦®à¦¿à¦•à¦®à§à¦ªà§‡à ° মতো এবং চিরস্মরণীৠ! জবাবটি হচ্ছে 'মেরা পাস মা হ্যায়' অর্থাৎ মায়ের সঙ্গ ও উপস্থিতি বা অস্তিত্বেঠ° কাছে পৃথিবীর সকল ঐশ্বর্য্য, ম্লান ও তুচ্ছ। এই মা থাকার মর্ম অনেকটা কবিতার মতো, যে বোঝে, কেবল সেই বোঝে, অন্যকে বোঝানো খুবই দুষ্কর, প্রায় যায়-ই না বলা যায়।
সন্তান হিসেবে এই বোঝাবুঝির বয়সে পৌঁছাতে পৌঁছাতে এক একজনের মা তার ধূসর জীবনের গোধূলি পার করে এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছান যে, হয়তো সন্তানের জীবনে তো বটেই সাথে সাথে তার গোটা সংসারে ছায়াগাছ হয়ে থাকতে থাকতে, সমগ্র পরিবারের বোঝা বইতে বইতে যখন একটু নিস্তার চান, বা হয়তো তিনি ও না, তার অবচেতনে তার শরীরই চায় এই নিস্তার তখনই দুর্ভাগ্যঠ্রমে নিয়তির পরিহাসে অধিকাংশ সময়ই তিনি সংসারের বোঝা হিসেবে গণ্য হন, তার উপিস্থিতি বা অস্তিত্ব যে ক্রমশই তার অনেক প্রিয়জনের কাছেই অনভিপ্রেত ঠেকছে এটা তিনি মর্মে মর্মে উপলিব্ধ করতে করতে অসহায়ভাবে শুধু থেকে যান, থেকেই যান শুধু অনাদরে, উপেক্ষায় অপমানে। লোভ, ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্ঠার্থ, অবমাননা,à¦…à¦ªà ®à¦¾à¦¨ এখন তার নিত্য সঙ্গী। ভাতের গ্রাস অশ্রু দিয়ে মেখে না খেলে এখন আর তা সহজে পরিপাক হতে চায় না। পরিবারে এখন তার চাইতেও বেশি চাহিদা,মূলৠà¦¯ ও খাতির এমনকি গৃহভৃত্যেঠ°à¦“। সন্তান-সন্ঠতি নয়, এখন তার একমাত্র সঙ্গী স্মৃতি, স্মৃতির সুখস্পর্শ তাকে যেটুকু উত্তাপ দেয় জীবনের; নইলে শীতের রাতে বিছানায় শুলে তার যখন খুব শীত করে, একটা বাড়তি কম্বল তার লাগবে কিনা একথা কেউ জিজ্ঞেস করে না!একাদশীর দিন তার খাবার নিয়ে কারোরই কোন মাথাব্যথা নেই। শরীরটা মাঝে মাঝেই বেশ খারাপ লাগে, কিন্তু কারোরই মনে হয় না তাকে ডাক্তার দেখানোর কথা। তাকে চেয়ে নিতে হবে সব! বলতে হবে,বৌমা আমাকে একটা সাবান দেবে? বলতে হবে বড়খোকা আমার চশমার ডাঁটিটা ভেঙ্গে গেছে সারিয়ে দিবি? বলতে হবে ছোটখোকা আমার প্রেসারের ওষুধটা ফুরিয়ে গেছে এনে দিবি? অথচ এই তিনিই না একসময় বলেছিলেন খোকাদের বাবাকে-'বড়খ §‹à¦•া পাশ করে বসে আছে এবার তুমি ওকে মাসে মাসে একটু হাতখরচ দাও।' 'ছোটখোকার খেলার বুট্ লাগবে কিনে দিও্' 'পিংকিকে কোচিং-এ ভর্ত্তি করে দাও।' 'মায়ের জন্য একটা আঙুল কাটা মোজা এনে দাও। চটির সাথে পড়তে পারবেন'....ইতৠযাদি; আর এখন সেইসব দিনের কথা মনে পড়ে....যতদিন শারীরিক শক্তি সামর্থ্য ছিল, কর্তাও জীবিত, ততদিন তার সুখ শান্তিতেই কেটেছে। অভাব-অনটন তো ছিলই, তবু সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর রাত্রিবেলঠয় তাঁর মতো পাড়াগাঁয়েঠ° মায়েদের হ্যারিকেনৠ‡à¦° আলোতে হলেও, 'নবকল্লোল;, 'সিনেমা জগৎ'টা পড়ার অবসর ও বিলাসটুকু অন্তত ছিল। ভবিষ্যৎ-চিঠ্তা, নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে আখের গোছানোর কোন বালাই তখন ছিল না। মা যদি শাড়ী রিফু করে পরতেন, তো বাবাও জুতো মেরামত করে করে চালিয়ে নেন যতদিন চালানো যায়। ছেলের স্কুলের টিউশন ফী বাকী। মুদি দোকানে ধার-বাকির পাহাড়, কিন্তু মূ্ল্যবোধঠŸà¦¾ প্রখর।স্বঠর্থপরতা, প্রবঞ্চনা, তঞ্চকতা ছিল নিন্দনীয়-হঠ¾à¦¤à§‡ টাকা আসতেই ধার-বাকি শোধ। মূল্যবোধ এমনই যে পোস্টকার্ঠ¡à§‡à¦° অভাবে সময়মতো বড়দাদাবাবু বা পিসীমাকে বিজয়ার প্রণাম না জানাতে পারলে মনোকষ্ট ও অপরাধবোধ হতো। মূল্যবোধ ঘেরা এমন সংসারের আনাচে কানাচে, সর্বত্র শুধু মায়েরই দৃষ্টি, যত্ন, মমতা, সোহাগ, অনুকম্পা, ক্ষমা ও ভালোবাসা। রান্নাবান্ না ঘরবাড়ি পরিস্কার-পঠ°à¦¿à¦šà§à¦›à¦¨à§à¦¨ করার কথা না হয় বাদই দিলাম, আরও কতো কিছুই না করতে হতো তাকে। কখনো তিনি একটা হেলে পড়া লঙ্কা গাছকে সোজা করে দিচ্ছেন। কখনো বা চালের পুরনো পাটের বস্তা কেটে গোরুর গায়ের শীত নিবারণী জামা বানাচ্ছেনॠ¤ চালের খুদ, গমের দানা ছিটিয়ে হাঁস মুরগি পাখিদের à¦–à¦¾à¦“à§Ÿà¦¾à¦šà§à¦›à§‡à ¦¨à¥¤ পরিবারের কারো সাধারণ অসুখ-à¦¬à¦¿à¦¸à§à¦–à §‡ তিনিই পথ্য করছেন; চটজলদি, সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসাটুঠুও করছেন। সর্দ্দিকাঠিতে কালোজিরে দিয়ে পেঁয়াজ রসুন ভাজা, বাসকপাতা-তৠà¦²à¦¸à§€à¦ªà¦¾à¦¤à¦¾ মধু মিছরি ও আদা গোলমরিচ দিকে ক্বাথ বানানো, হাত পা কেটে গেলে গাঁদা ফুলের পাতা চটকে প্রলেপ, কাচে পা কেটে গেলে প্রদীপের সলতে পুড়িয়ে ক্ষতস্থানৠসেঁক, পুড়ে গেলে টুথপেস্ট বা আলু থেঁতো করে লাগানো, পা মচকে গেলে চুন-হলুদ গরম করে লাগানো-এই করতে করতেই দিন দিন মা আমাদের আরও আরও গভীরতম মা। মা যেন তখন এক চিরস্থায়ী পূর্ণিমা আমাদের জীবনে।
আহা, আমাদের মা আর আমাদের জীবন। আমাদের জীবন মানে আমাদের সম্মিলিত জীবন। এখন তার অস্তিত্ব অনুভব করাটাই দু:সাধ্য। এখন যেন আমাদের à¦ªà§à¦°à¦¤à§à¦¯à§‡à¦•à§‡à ° আলাদা আলাদা জীবন। আমাদের গভীর গভীরতর অসুখ এখন। আমাদের সময় নেই, আমাদের অনেক সমস্যা! কিন্তু মা ? মা, অবিচল আমাদের মা, মায়ের কোন সময়ের অভাব বা সমস্যা নেই; তিনি বসে আছেন অশীতিপর, অশক্ত, হয়তো বা আংশিক পক্ষঘাত বা বাতের ব্যথায় পঙ্গু, শারীরিক সামর্থ্যহৠন, à¦•à¦ªà¦°à§à¦¦à¦•à¦¶à§‚à¦¨à à¦¯à¥¤ সৌভাগ্য-à¦•à§‡à ¦‰ কেউ এখনও তাকে পরিবারের এক অনিন্দ্য আলপনা এক মাঙ্গলিক স্বস্তিক চিহ্ন, এক অনুপম লক্ষ্মীশ্ঠ°à§€ ভাবেন। সত্যিই তিনি এক সুবাতাস! তবুও বিষন্ন তিনি। কিছুতেই আমাদের এই মা মৃত্যুর পর টোটেম হতে চান না, আদ্যশ্রাদৠধ, বৃষোৎসর্গ, গয়ায় পিন্ডদান কিছুই চান না। জীবদ্দশায়ঠতিনি শুধু চান মায়ের সম্মান ও প্রকৃত মর্যাদা। তিনি তার ইচ্ছেমত নাতি-নাতনিঠজন্য চকোলেট বা অন্য সামান্য কোনোকিছু কিনে দেওয়ার ক্ষমতা চান, ছেলের জন্মদিনে কেক-পেস্ট্ ¦°à¦¿à¦° পাশাপাশি অন্তত: পায়েসটুকুॠ¤
তিনি তার মতামত ব্যক্ত করার স্বাধীনতা ও সাহসটুকু ফিরে পেতে চান। মনে মনে কথা বলতে বলতে তিনি ক্লান্ত,à¦…à¦¬à ¸à¦¨à§à¦¨, বিষন্ন। চলো মাকে সাহস দিই, অশক্ত মায়ের পাশে বসে গল্প করি, তাকে স্পর্শ করি, চলো মাকে খুব হাসিয়ে আসি। মা কিছুই চায না, শুধু আমাদের, তার সন্তান সন্ততিদের চায়, চলো দেরী কোরো না; দেরী করলে পাপ হবে। মা না হাসলে আমাদের পাপ হবে।